শিরোনাম

আজ পবিত্র মধু পূর্ণিমা

শহীদুল ইসলাম: বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি:

সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পূণ্যস্মৃতি বিজরিত এ দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করেন। বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলো মধু পূর্ণিমা। মধু পূর্ণিমার অপর নাম ভাদ্র পূর্ণিমা। ভাদ্র মাসে এ পূর্ণিমা তিথি অনুষ্ঠিত হয় বলে মধু পূর্ণিমাকে ভাদ্র পূর্ণিমা বলা হয়। এ দিনটি পালনের পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ঘটনা। ভগবান গৌতম বুদ্ধ হলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। সূত্রপিটকের মহাবগ্গ কোশাম্বী স্কন্ধ মতে, মহামানব গৌতম বুদ্ধ জীবদ্দশায় বুদ্ধত্ব লাভের দশম বর্ষে বর্তমান ভারতের কোশাম্বীর ঘোষিতারামে তথাগতের নবম বর্ষাবাস অতিবাহিত করেন। সেখানে থাকার সময় দু’জন ভিক্ষু – বিনয়ধর ও সূত্রধরের মধ্যে শৌচাগারে জল রাখা বিষয়ে বিনয় বিধান নিয়ে কলহের সৃষ্টি হয়। তথাগত বুদ্ধ তাদের বিবাদ মেটানোর জন্য নানা নির্দেশনা প্রদান করলেন। তাদের মধ্যে মিত্রতা, বুন্ধত্ব, ঐক্য এবং সংহতি সৃষ্টির জন্য নানা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই ভিক্ষু দু’জন মোটেই বুদ্ধের কথায় কান দিলেন না। পরে ভগবান বুদ্ধ দশম বর্ষাবাসের জন্য পারিলেয়্য বনে চলে যান। সেখানে গিয়ে বুদ্ধ দেখতে পেলেন একটা বৃদ্ধ হাতি অন্য হাতিদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে অখাদ্য, অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে বেঁচে আছে। বুদ্ধ তখন তাকে সেবা-শুশ্রুষা করা শুরু করলেন। এর বিনিময়ে হাতিও বুদ্ধকে সেবা করলেন নানাভাবে। তাঁর থাকার জায়গা করে দিল, দিনরাত পাহারা দিত, বনের ফলাদি আহার্য এনে দিত, বুদ্ধের ব্যবহার্য জল এনে দিত। ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষার জন্য বের হলে পাত্র নিয়ে যেত। মানুষের মতো পশুর মধ্যে বোধশক্তি আছে তা-ই প্রমাণ করল এই হস্তীরাজ। বুদ্ধ এবং হাতির এমন সম্পর্ক দেখে বনের বানরের মনেও বুদ্ধকে সেবা করার ইচ্ছা জাগে। ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে বানর একটি মৌচাক সংগ্রহ করে বুদ্ধকে দান করে। মৌচাকে ছানা ও ডিম থাকায় ভগবান বুদ্ধ মধু পান করলেন না। বানর তা দেখে তা পরিষ্কার করে আবার বুদ্ধকে দান করলে বুদ্ধ মধু পান করলেন। এতে বানর অত্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। খুশিতে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফাতে হঠাৎ গাছের শাখা ভেঙ্গে বানরটি গাছের গোড়ায় পড়ে মৃত্যুবরণ করল। পরে বানরটি ত্রয়বিংশ দেবলোকে জন্মগ্রহণ করে। অন্যদিকে ভিক্ষুরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বর্ষাবাস শেষে তাঁরা বুদ্ধের সেবক আনন্দকে নিয়ে বুদ্ধকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। এ শোকে কাতর হয়ে হাতি হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। সেই হাতিও মৃত্যুর পর ত্রয়বিংশ দেবলোকে জন্মগ্রহণ করে। ভগবান গৌতম বুদ্ধের সমগ্র জীবন ইতিহাস প্রকৃতির হাত ধরে। রাজকীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও রাজপ্রাসাদে জন্ম হয়নি। তাঁর জন্ম হয়েছিল হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত লুম্বিনী কানন বাগানে। পরবর্তীতে তিনি বিত্তবৈভব, পরিবার-পরিজন এবং রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য গৃহত্যাগ করেন। মানবজীবনের দুঃখ দৈন্যতা দেখে দুঃখ মুক্তির জন্য বুদ্ধ কঠোর ধ্যান সাধনা করেন গভীর অরণ্যে। দীর্ঘ ছয় বছরের সাধনায় চরম সত্য উদঘাটন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে যখন তপস্যা করেছিলেন তখন বনের সব পশু-পাখির সঙ্গে ছিল তার মৈত্রী পরায়ণ। বৌদ্ধধর্মের নীতিকথা, ‘অহিংসা পরম ধর্ম ’। শুধু মানুষ নয়, যে কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করা পাপ। ধম্মপদে উল্লেখ আছে, ‘নহি বেরেন বেরানি সমন্তী’ধ কুদাচনং অবেরন চ সম্মন্তি, এস ধম্মোা সনন্তনো’ অনুবাদ: শত্রুতার দ্বারা কখনও শত্রুতার উপশম হয় না। শত্রুহীনতার বা মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতা প্রশমিত হয় বা শত্রুকে জয় করতে হয় – এটিই হলো সনাতন ধর্ম। মহামানবের প্রতিটি বাণীই মানবজীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধরা হাতির সেবা ও বানরের এই মধুদানকে কেন্দ্র করে ভাদ্র পূর্ণিমায় মধু পূর্ণিমা উদযাপন করে থাকে। এ দিনে বৌদ্ধরা নতুন জামাকাপড় পরে বিহারে যায়। দানচিত্তের উদ্ধোধনের মাধ্যমে ভিক্ষু শ্রমণকে মধুদান করে। অন্যান্য পূজার মতোই বুদ্ধপূজা, প্রদীপ, ধূপপূজা ভিক্ষুকে আহার্য দান, ধর্মীয় সভা, বুদ্ধ-কীর্তন পরিবেশন হয়। এছাড়া বিহারে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চলে। দশশীল, অষ্টশীল গ্রহণ করে উপাসনা-ধর্মালোচনার মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হয়।


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language