শিরোনাম

আরডিসি নাজিম উদ্দীন সাসপেন্ড হচ্ছেন

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানের বাড়িতে মধ্যরাতে হানা এবং তাকে তুলে নিয়ে জেল-জরিমানা দেয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ওই ঘটনায় জড়িত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা এবং এসএম রাহাতুল ইসলামকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে কুড়িগ্রামের নতুন ডিসির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সোমবার এ সংক্রান্ত একাধিক আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্যাতনের নেতৃত্বদানকারী আরডিসি নাজিম উদ্দীনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতে পারে। তিনি এর আগে কক্সবাজারে কর্মরত থাকাকালে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে বিষয়গুলোর ব্যাপারেও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এগুলো পাওয়া মাত্রই তাকে বরখাস্ত করা হবে।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘নাজিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে এর আগে বেশ কয়েকবার অভিযোগ এসেছে। তবে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে হয়। এখন তার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটি খুবই কঠিন। এটা তার এবং তার চাকরি, পরিবার ও সামাজিক অবস্থার জন্য বেদনাদায়ক ও অপমানজনক হবে।

এরই মধ্যে আমরা সংশ্লিষ্টদের নাজিমের আগের কর্মস্থল কক্সবাজারের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছি। শিগগিরই তার সব কর্মকাণ্ডের সব খবর আমাদের কাছে আসবে। এরপরই তাকে বরখাস্ত করা হবে।

তথ্যপ্রমাণ ছাড়া বরখাস্ত করলে সে আদালতে চলে যেতে পারে। তাতে কোনো কাজ হবে না। তাই সবকিছু সংগ্রহ করেই তার ভিত্তিতে তাকে বরখাস্ত করা হবে। এমনকি ডিসি সুলতানা পারভীনের বিষয়েও কঠিন সিদ্ধান্ত হবে।’

জানা যায়, বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা সুলতানা পারভীন ২০১৮ সালের ৩ মার্চ থেকে কুড়িগ্রামে ডিসির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কুড়িগ্রাম শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর তিনি নিজের নামানুসারে ওই পুকুরের নাম ‘সুলতানা সরোবর’ রাখতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এর জেরে বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে শুক্রবার গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মাদক রাখার অভিযোগ এনে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা অভিযান পরিচালনা করেন।

গভীর রাতে সাংবাদিককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সাজা দেয়ার ঘটনায় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহল তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে এই ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন রোববার সাংবাদিকদের জানান, তদন্তের মধ্যে আমরা অনেক অনিয়ম দেখেছি এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেছি। তার (ডিসি) বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিউর অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

রোববার জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরিফুল। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার) নাজিম উদ্দীন বাড়িতে ঢুকে আমাকে পেটান। আর এনকাউন্টারে দেয়ারও হুমকি দেন।

হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পর আমাকে বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। জেলা প্রশাসকের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন লেখার কারণেই আমার ওপর নিগ্রহ চালানো হয়েছে।’

এদিকে সাংবাদিককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের (টাস্কফোর্স) মাধ্যমে কারাদণ্ড দেয়ার সব নথি (রেকর্ড) চেয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী সোমবারের মধ্যে নথি রাষ্ট্রপক্ষকে আদালতে দাখিল করতে হবে। একই সময়ের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেয়া পদক্ষেপও জানাতে হবে।

সোমবার বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত শুনানিতে বলেছেন, একজন ব্যক্তি বা একজন পদধারী রাষ্ট্র বা সরকারকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

ওই ব্যক্তি বা পদধারী যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকার যদি তাকে সমর্থন না দেয়, সেটাই হবে আইনের শাসন। আর সরকার বা রাষ্ট্র যদি ব্যক্তির অন্যায় কাজে সমর্থন দেয়, সেটা হবে আইনের লঙ্ঘন।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন ও আইনজীবী ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল দেবাশিস ভট্টাচার্য।

এর আগে রোববার সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে দেয়া সাজা ও দণ্ডের আদেশের অনুলিপি, অভিযান কারা পরিচালনা করেছে, মোবাইল কোর্ট নাকি টাস্কফোর্স, রাতে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আইন অনুসারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কি না, অভিযান পরিচালনার কারণ এবং আইন অনুসারে ঘটনা কার সম্মুখে কখন সংঘটিত হল, তা জানাতে রাষ্ট্রপক্ষকে জানাতে নির্দেশ দেন।

এ আদেশ অনুসারে রাষ্ট্রপক্ষ নথির ফটোকপি দাখিল করে। শুনানিতে আদালত বলেন, ‘কুড়িগ্রামের ওই ঘটনার পর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, ডিসি যদি অপরাধ করে তাহলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। আমরা ওনার বক্তব্যের প্রশংসা করছি। আমরা মনে করি, আমরা একজন ভালো মন্ত্রী পেতে যাচ্ছি।’

আরিফুলের শারীরিক অবস্থার উন্নতি : কুড়িগ্রাম থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরিফুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তিনি। আরিফুল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ওষুধপত্র খাওয়ার পর এখন শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এছাড়া বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্য সারা দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আরিফুলের স্ত্রী নিতু জানিয়েছেন, স্বামী-সন্তানসহ তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রেদওয়ান ফেরদৌস সজীব জানান, আরিফুলের স্বাস্থ্যগত সমস্যা আপাতত নেই। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।

সমাবেশ-মানববন্ধন : আরিফুলের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং নির্যাতনকারীদের শাস্তির দাবিতে সোমবার সংবাদকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ কুড়িগ্রাম শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

এছাড়া কিশোরগঞ্জ, লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শেরপুর, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ, জয়পুরহাট, রংপুর, নেত্রকোনা, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া, পাবনার সাঁথিয়া, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, বাগেরহাট, নরসিংদী, বরগুনার বামনা, মাদারীপুরের কালকিনি ও নওগাঁয় সমাবেশ ও মানববন্ধন হওয়ার খবর দিয়েছেন এসব এলাকায় দায়িত্বরত প্রতিনিধিরা।


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language