শিরোনাম

গহীন অরণ্যে স্বর্গীয় অনুভূতি বান্দরবানের লামার দৃষ্টিনন্দন ‘মাছকুম’

 মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম:

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলার দৃষ্টিনন্দন স্থান মাছকুম। বিশাল বিশাল পাথর ধাপে ধাপে সাজানো। ছলছল ছন্দে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ৩০ ফুট প্রশস্ত মাছকুমটির দু’ পাশে সরু গুহা। এমন স্থানের সৌন্দর্য উপভোগে সম্প্রতি ঘুরে এলাম মাছকুম।

লামা উপজেলার ছোট একটি গ্রাম্যহাট রূপসীপাড়া বাজার। লামা উপজেলা শহর হতে সাড়ে ৯ কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত বাজারটি। পিচঢালা পাকা পথটিতে যেকোন গাড়িতে করে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সকাল সাড়ে ৬টায় পৌঁছে গেলাম রূপসীপাড়া বাজারে। বাজারে নাস্তা শেষ করে অনিন্দ্য সুন্দর ‘লামা খালের মাছকুমের’ উদ্দেশে রওনা দিলাম। বাজার থেকে নদীপথে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে আরো ৯ কিলোমিটার পূর্বে নাইক্ষ্যংমুখ বাজার ও চুমপুং হেডম্যান পাড়া পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে ৫/৬ কিলোমিটারের বেশি যাওয়া যায় না। তখন বাকি পথ হেঁটে যেতে হয়। অপরদিকে রূপসীপাড়া বাজার হতে সদ্য নির্মিত হওয়া রূপসীপাড়া টু মংপ্রু পাড়া সড়কে ৪ কিলোমিটার রাস্তা মোটর সাইকেল বা জিপে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নৌকার মাঝি মো. শফিক আর স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী মো. রফিক ভাইকে গাইড হিসেবে সাথে নিয়ে যাত্রা শুরু। রূপসীপাড়া বাজার জায়গাটা মোটামুটি পরিচিত হলেও গুগল ম্যাপে বাজারটা পাওয়া গেল না। তবে লামা-রূপসীপাড়া সড়কটি গুগল ম্যাপে রয়েছে। রূপসীপাড়া বাজার গুগল ম্যাপে না থাকলেও বাজারের একটি রেস্টুরেন্ট ‘হোটেল মারুফ’ ম্যাপে রয়েছে।

আমি, নৌকার মাঝি আর বন্ধুবর ব্যবসায়ী মো. রফিক তিনজন খুব সকালে নৌকায় করে লামা খাল দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। আকাশ খুব পরিষ্কার। চকচকে সূর্যের আলো ছাপিয়ে গেছে চারদিক। কাউকে গন্তব্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে হয়নি। কারণ মাঝি ও গাইড রফিক ভাইয়ের সব চেনা। সবেমাত্র দিন শুরু হওয়ায় কিছু কিছু গ্রামের বধূরা বাড়ির জিনিসপত্র ধোয়ার জন্য খালের পাড়ে এসেছে। নৌকা তাদের কাছাকাছি যেতেই সবাইকে শাড়ির আঁচল মুখে টেনে ঘোমটা করতে দেখা গেল।
নৌকার ধাক্কায় জলের ছলছল শব্দে অন্যরকম এক মুহূর্তের অনুভব হচ্ছিল। খালের দুই পাড়ে ছোট ছোট কয়েকটি গ্রাম দেখা গেল। লোকালয়, সবুজ ধানক্ষেত, ফসলের মাঠ আর কাছাকাছি আবছা পাহাড়। অসংখ্য পাখির দেখা পেলাম। অনেক বাঙালি জীবন ও জীবিকার কারণে পাহাড়ে বসবাস করতে শুরু করেছে। যতই পাহাড়ের গভীরে যাচ্ছিলাম ততই মার্মা,   ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজনের দেখা মিলল। নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি পাড়ারও দেখা মিলল। লক্ষ্য উঁচু সবুজ পাহাড়ে আমরা মিশে যাব। দু’ পাশে ক্ষেত আর সবজি বাগান আমাদের জন্য আরেক সবুজের বিছানা পেতে রেখেছে। আমরা স্বর্গীয় পথে এগোতে এগোতে প্রায় দু’ ঘণ্টা নৌকায় চড়ে নাইক্ষ্যংমুখ বাজারে পৌঁছালাম। সামনে আর দোকানপাট নেই। তাই পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে সেখানের একটা দোকানে খাবারের অর্ডার করলাম।
সামান্য বিশ্রাম ও খাবার সাথে নিয়ে আবারো যাত্রা শুরু। আরো ২ কিলোমিটার নৌকায় চড়ে চুমপুং হেডম্যান পাড়ায় পৌঁছালাম। খালের পানি কমে যাওয়ায় আর নৌকায় যাওয়ার সুযোগ নেই। সেখানেই নেমে গেলাম। স্রােতের বিপরীতে পাহাড়ের ভিতরে খালের সামান্য পানিতে হাঁটতে লাগলাম। লক্ষ্যস্থান ‘লামা খালের মাছকুম’ যাওয়া। পাহাড়ের উঁচুতে কিছু লোকালয় পেলাম, মুরুং উপজাতিরা থাকে। পাহাড় ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা। তারা ঝিরির পানি পরিশোধন করেই পান করে। প্রাকৃতিকভাবে ফিল্টারিংয়ের কিছু পদ্ধতিও আমরা দেখতে পেলাম।

নদীপথের ঠা-া পানিতে হাঁটতে হাঁটতে পুরো শরীরে একটা ঠা-া প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছিল। বড় বড় পাথরের দেখা পাচ্ছিলাম। দুর্গম আকা-বাঁকা পথে এগোতে এগোতে আরো ৪ কিলোমিটার হেঁটে বেলা ১১টায় মাছকুমে পৌঁছে গেলাম। একপর্যায়ে পেয়ে গেলাম মাছকুমের দেখা। ঘনবৃক্ষ ও গিরিখাত হওয়ায় দিনের সূর্যের আলো সবেমাত্র তাপ ছড়ানো শুরু করেছে।

পাথরের প্রশস্ত পাহাড়ের উচ্চতা বেয়ে ধেয়ে আসছে পানির ঢল। দৃষ্টিনন্দন মাছকুম। পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠলে বিশাল ছাদ। দৃষ্টিনন্দন জায়গা। বিশাল বিশাল পাথর ধাপে ধাপে সাজানো। ছলছল ছন্দে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তার ওপরের দিকে ছোট ছোট বেশ কয়েকটা স্তর বেয়ে ধেয়ে আসছে জলস্রােত। প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ৩০ ফুট প্রশস্ত মাছকুমটি। দু’পাশে সরু গুহা, তার ওপর থেকে ধীরগতিতে আসছে পানি। এই জায়গায় সাঁতরে যেতে হয়। ঠা-া হিমশীতল পানি। এডভেঞ্চার মানসিকতা না থাকলে যাওয়া অসম্ভব। চুমপুং পাড়া হতে কয়েকজন স্থানীয় মুরুং যুবক আমাদের সাথে গিয়েছেন। স্থানীয়রা বলেন, এই কুমে বড় বড় মাছ রয়েছে। তারা অনেকে এই কুমকে দেবতার কুম বলে জানে। কল্যাণের বিশ্বাসে তারা এখানে সকাল-সন্ধ্যা মোমবাতি জ্বালায়। তারা এই কুমে মাছ আছে জেনেও অমঙ্গল হবে ভেবে মাছ ধরতে আসে না। মাছকুম থেকে আরো একটা বড় পাহাড় ট্র্যাকিং করে ওপরে উঠতে হলো আমাদের। সেই পাহাড়ে হেঁটে হেঁটে আবার নামলাম ঝিরি পথে। এই পথটা অনিন্দ্য সুন্দর। বর্ণনায় ধরা যায় না। দুই পাশে উঁচু পাহাড়, একটু পর পর বড় বড় পাথর। আর পুরাটা হাঁটার পথ শক্ত পাথরে বাঁধাই করা। তার ওপর দিয়ে ঝিরি ঝিরি পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কলকল শব্দ। এই পথে হাঁটতে অপার্থিব সুখ। অনিন্দ্য সুন্দর এই পথ পাড়ি দিয়ে সামনে আরো ৬ কিলোমিটার গেলে দেখা মিলবে লামা খালের উৎপত্তিস্থল ‘ব্যাং ঝিরি মুখ কমলা বাগানের’। এখানেই ব্যাং ঝিরি ও ২৬ কিলোমিটার হতে বয়ে আসা ছোট ঝিরিটি মিলিত হয়ে লামা খালের জন্ম হয়েছে। অনেকে লামা খালের উৎপত্তিস্থান হিসাবে ২৬ কিলোমিটারের মিঠু পাড়াকে মনে করেন। এদিকে কমলা বাগানের বাম পাশ দিয়ে প্রবাহিত ব্যাং ঝিরির মুখে রয়েছে কুরিং মুরুং পাড়া। প্রকৃতির চাদরে সাজানো মুরুং পাড়াটি সবার নজর কাড়বে। কুরিং পাড়ায় একটি বিশাল বটবৃক্ষ প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা দখল করে ২ শত বছরের কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুরং সম্প্রদায়ের লোকজন এখানে পূজা করেন। মাছকুমের পর থেকে এই পথটাই আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছে। বিকেল ৩টায় আমরা ফিরে আসলাম চুমপুং হেডম্যান পাড়ায়। সেখানে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানলাম পাশেই রয়েছে আরেকটি সুন্দর স্থান। যার নাম গোদা ঝিরি মাছকুম ও ঝরনা। অনেকে কচ্ছপ কুমও বলে থাকেন। লামা খালের মাছকুমের মতো প্রাকৃতিক দৃশ্যের দেখা এখানে পেলাম। গোদাঝিরি মাছকুমের উপরে রয়েছে সুন্দর গোদাঝিরি ঝরনা। এই ঝরনাটা দৃষ্টিনন্দন এবং বেশ প্রশস্ত। কিন্তু পানির গতিবেগ কম। এরপর নেমে আসার পালা। আবার সেই স্বর্গীয় ঝিরিপথ মাড়িয়ে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত কিন্তু পরিতৃপ্ত আমরা।

ফিরে আসার পথে নৌকা অনেক গতিতে চলল। ভ্রমণটা ও পরিবেশের সৌন্দর্য অসাধারণ। পিছনে পাহাড়। রোদ খেলা করছে। সূর্য ফিরে যাচ্ছে তার কক্ষপথে আর আমরা নিজ গন্তব্যের পথে। চারিদিকে সবুজের আস্তরণ। মন বলে, এই যাত্রা যদি শেষ না হতো! এই পথে যদি অন্তহীন হাঁটতে পারতাম! পাহাড়, ঝরনা ও মাছকুমের সৌন্দর্য বারবার আপনাকে টানবে। এই সৌন্দর্য ভোলার নয়।


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language