শিরোনাম

পুলিশের ব্যাগে আনা হতো মাদকের চালান

পুলিশ সদস্যের ব্যাগ কেউ তল্লাশি করে না। তাই সীমান্ত এলাকার বাড়ি থেকে ফেরার পথে ফেনসিডিলের চালান নিয়ে ঢাকায় আসত পুলিশের কয়েকজন সদস্য।

এভাবে তারা মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এ মাদক সিন্ডিকেটের পেছনে তিন কনস্টেবল ও এক কনস্টেবলের স্ত্রী রয়েছে। যুগান্তরকে পুলিশসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট শাখায় কর্মরত কনস্টেবল সুয়েজ খান ও আসাদুজ্জামান, সাময়িক বরখাস্ত কনস্টেবল জুয়েল খান এবং জুয়েল খানের স্ত্রী লিজা বেগম মাদক সিন্ডিকেটটি গড়ে তোলেন।

এছাড়া এ সিন্ডিকেটে ডেমরার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ অস্ত্রধারী শিবলী আহাম্মদ খানসহ ১০-১২ জন সদস্য রয়েছে। এরইমধ্যে কনস্টেবল সুয়েজ ও আসাদুজ্জামান, মাদক ব্যবসায়ী শিবলী এবং লিজাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

তাদের বিরুদ্ধে ডেমরা থানায় দুটি এবং মতিঝিল ও খিলগাঁও থানায় একটি করে মামলা হয়েছে। চারটি মামলার মধ্যে তিনটিই মাদক মামলা। অপরটি অস্ত্র মামলা।

এর আগে মাদকসহ গ্রেফতার হওয়ায় জুয়েল সাময়িক বরখাস্ত হন। এরপর তার স্ত্রী লিজা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। জুয়েল এখন পলাতক।

তাকেসহ সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। সূত্র জানায়- জুয়েল, আসাদুজ্জামান, লিজা ও শিবলীকে গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার এসআই কাউছার আহাম্মদ খান।

শুনানি শেষে আদালত তিনজনের প্রত্যেককে চারদিনের এবং লিজাকে একদিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন। রিমান্ডের শুরুতে শুক্রবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদে তারা মাদক সিন্ডিকেটের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।

তারা জানান, দুই পুলিশ কনস্টেবলের বাড়ি দিনাজপুরে। ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় বাড়ি হওয়ায় তারা ফেনসিডিল ঢাকায় এনে পাইকারি বিক্রি করত। পাশাপাশি খুচরাও বিক্রি করেন।

ভারত থেকে প্রতি বোতল ফেনসিডিল ঢাকায় আনতে তাদের ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো। পাইকারি ১০০০ হাজার ও খুচরা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় ফেনসিডিল বিক্রি করা হতো।

তারা মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে যেত। বাড়ি থেকে ফেরার সময় ফেনসিডিলের চালান নিয়ে তারা ঢাকায় আসত। পুলিশের ব্যাগে করেই তারা ফেনসিডিল আনত। পুলিশ সদস্য হওয়ায় তাদের ব্যাগ কেউ তল্লাশি করত না বলেও জানায় তারা।

আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের নির্দেশে সম্প্রতি পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু হয়। এরই অংশ হিসাবে সুয়েজ খানের টেস্ট করা হয়। ডোপটেস্টে পজিটিভ আসার পর ২০ অক্টোবর থেকে সুয়েজ অফিসে গরহাজির বলে মতিঝিল থানা পুলিশকে তিনি জানিয়েছেন।

তিনি জানান, ডোপটেস্টে পজিটিভ হওয়ার পরই বুঝতে পারেন- তার চাকরি থাকবে না। তাই অফিসে অনুপস্থিত থেকে তিনি জোরালোভাবে মাদক ব্যবসা শুরু করেন। মাদক ব্যবসাকেই জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস হিসাবে মনে করেন। গ্রেফতার আসাদুজ্জামান জানান, তিনি পুলিশ ক্রিকেট টিমের একজন সদস্য। এ মাদক সিন্ডিকেটের তিনিই নেতৃত্ব দেন।

অস্ত্র ও ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার শিবলী মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকে তিনি মাদক ব্যবসার ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেন।

পুলিশের নেতৃত্বাধীন এ মাদক চক্রকে কীভাবে শনাক্ত করা হলো জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, এক সোর্সের মাধ্যমে প্রথমে বিষয়টি জানতে পারি। পরে ওই সোর্সের মাধ্যমে ক্রেতা সেজে ফেনসিডিল কেনার প্রস্তাব দেই। ১৫ বোতল ফেনসিডিল কেনার জন্য ১৫ হাজার টাকা দাম নির্ধারণ করি।

ছদ্মবেশধারী পুলিশের কাছ থেকে লিজা ওই টাকা নেন। পরে সুয়েজ ফেনসিডিল সরবরাহ করেন। এ সময় লিজা ও সুয়েজকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর সুয়েজ জানান, তার ব্যাচমেট আসাদুজ্জামান এ চক্রের মূলহোতা। আসাদুজ্জামানের কাছে আরও ফেনসিডিল মজুদ আছে। এরপর আসাদুজ্জামানকে ফেনসিডিলসহ তার খিলগাঁও নন্দীপাড়ার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। আসাদুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেমরায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদকসহ শিবলীকে গ্রেফতার করা হয়।

বৃহস্পতিবার মতিঝিল থানায় করা মামলায় বাদী এসআই সফিকুল ইসলাম আকন্দ উল্লেখ করেন, ১৩ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে ফকিরাপুলের জি-নেট টাওয়ারের সামনের রাস্তায় কৌশলে অভিযান চালিয়ে সুয়েজ খান ও লিজা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়।

এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী- ওইদিন রাত দেড়টার দিকে খিলগাঁওয়ের ৬৭ নম্বর মধ্য নন্দীপাড়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে আসাদুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। তার শয়নকক্ষ থেকে পাঁচ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।

মামলায় বলা হয়, তিন আসামির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সহযোগী শিবলীর কাছে বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ও অস্ত্র মজুদ রয়েছে। পরে রাত আড়াইটার দিকে ডেমরা থানার রাজাখালী নবাব আলী মুন্সীবাড়িতে অভিযান চালিয়ে শিবলীকে গ্রেফতার করা হয়।

তার হেফাজত থেকে একটি খালি ম্যাগাজিনসহ ফাইবারের বাটযুক্ত সিলভার রংয়ের পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি তার শয়নকক্ষের ওয়ারড্রপ থেকে ২৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language