শিরোনাম

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞা ও সাহসিকতা

গ্রিক দার্শনিকসহ মধ্যযুগের খ্যাতিমান মুসলিম শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকরা একজন সফল মানবীয় গুণাবলিসমৃদ্ধ রাষ্ট্রনায়ক বোঝাতে ‘পরিপূর্ণ মানুষ’, ‘ইনসান-ই-কামিল’ ইত্যাদি অভিধা ব্যবহার করেছেন।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একবারই মাত্র এই জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল এবং সেটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৬৯-১৯৭১ সময়কালে। তবে চূড়ান্ত এ পর্বটিতে উন্নীত হওয়ার আগে পটভূমি হিসেবে পঞ্চাশের দশক আর প্রি-ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি টেস্ট হিসেবে ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক-সামাজিক ক্রিয়াকলাপে নেতৃত্ব প্রণিধানযোগ্য। আর এটা সম্ভব হয়েছিল তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে।

প্রজ্ঞাবান তিনিই, যিনি কঠিন কথা সহজ করে বলতে পারেন। গণমানুষের অব্যক্ত, অস্পষ্ট কথাগুলো বুঝতে পারেন, আর সেসব মনেপ্রাণে ধারণ করেন। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতাগুলো দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে, অনেকাংশে তাদেরই সহজসরল ভাষায়।

সহজসরল ভাষার সেসব বক্তৃতায় সাধারণ মানুষ আকৃষ্ট হয়েছিল, ঐতিহাসিক ছয় দফার ভিত্তিতে হয়েছিল ঐক্যবদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞার আরেকটি প্রকাশ ঘটেছিল তার ৭ মার্চের ভাষণে। সেই চরম সন্ধিক্ষণে জাতিকে কী বলা যায়, তা কেউ বুঝতে পারছিলেন না। সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও অনেক নেতা ছিলেন; কিন্তু কারও পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধু সেদিন জাতিকে কী দিকনির্দেশনা দেবেন।

মহান সৃষ্টিকর্তা তার মোজেজার বহিঃপ্রকাশ তার সৃষ্টির মাধ্যমে কখনও কখনও ঘটান। এর ছোট একটি উদাহরণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ শেষ করলেন, তখন বোঝা গেল এর চেয়ে ভালো বক্তৃতা আর হতে পারে না। এটি আজ বৈশ্বিক ঐতিহ্যিক সম্পদ।

এ মহান বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু একটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছিলেন। সেটি হল, একদিকে জাতিকে চরম ত্যাগ-তিতিক্ষা, যুদ্ধসহ যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা, অন্যদিকে বিশ্ববাসী যাতে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা।

উল্লেখ্য, শেষোক্ত ধারণাটির বাস্তবায়ন ও প্রচারণায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ছিল একটি যুদ্ধ-কৌশল। বঙ্গবন্ধু তার মাত্র ১৮-১৯ মিনিটের এক গভীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যময় ভাষণে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে এ দুটি বিষয়ের মধ্যে সমন্বয়সাধন তথা ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রকৃতজাত অকৃত্রিম সাহসিকতার কথা আলাদাভাবে বলার দরকার পড়ে না, এটা সর্বজনবিদিত। সেই তরুণ বয়স থেকেই তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে তার অদম্য সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সমীপে স্কুলভবন সংস্কারের দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে ‘খোকা’ শেখ মুজিব তার কল্যাণকামী মানবিক সাহসিকতার দৃষ্টান্ত রাখলেন।

পাঞ্জাবি শাসকদের বিরুদ্ধে তর্জনী উঁচিয়ে তিনি যেভাবে কথা বলতেন, তাতে কেঁপে কেঁপে উঠত শাসকদের মসনদ। নির্মোহভাবে, সৎ উদ্দেশ্যে গণমানুষের জন্য রাজনীতি করছেন বলেই এ অদম্য সাহস। পাকিস্তানিদের সব ধরনের আপস-ফর্মুলা তিনি অসম সাহসিকতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন সব সৌজন্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করে।

তিনি মনে করতেন মানুষের অধিকার ও মুক্তির জন্য কারাবরণ কিংবা কারাজীবন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি কারাবাস- সেই চরম দুঃসময়েও ভোগেননি মৃত্যু-আতঙ্কে। ১৫ আগস্ট নরপিশাচ ঘাতকের সামনে দাঁড়িয়েও ওর উদ্দেশ্য জানতে রাষ্ট্রনায়ক জাতির পিতার প্রশ্ন ও কণ্ঠস্বর ছিল তীব্র, অটুট ও অম্লান। পিতা শেখ লুৎফর রহমানের সেই বিখ্যাত উপদেশ ‘Honesty of purpose & honesty of intention’ থাকলে জীবনে ঠেকবা না- এটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিপালন করেছেন বিধায় আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

এটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সৎ সাহসেরই অন্যরূপ। তার প্রাসঙ্গিকতা সমকালীন। COVID-19 Pandemic-সহ যে কোনো প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে জাতীয় উন্নয়নের রোলমডেলকে এগিয়ে নিতে আজ আমাদের সম্মিলিত প্রজ্ঞা, সহসিকতা ও সততার সর্বোত্তম প্রয়োগের বিকল্প নেই।

ড. মো. আখতারুজ্জামান : উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language