শিরোনাম

বান্দরবানের লামায় ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়

সাইফুল ইসলাম:

সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বান্দরবানের লামায় গড়ে উঠেছে ৩০টি অবৈধ ইটভাটা। এসব ইটভাটায় ইট প্রস্তুত কাজে অসংখ্য শিশু শ্রমিক কাজ করছে। পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ, জ্বালানি হিসেবে বনজ সম্পদ উজাড় করা হচ্ছে নির্বিচারে।
লামার ফাইতং ও ফাঁসিয়াখালী এলাকার লোকজন জানান, ইটভাটার মাটি সংগ্রহ করতে গিয়ে ইতিমধ্যে উপজেলার ৩ শতাধিক ছোট-বড় পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে এবং বিশাল পরিমাণের জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পাহাড়ি এলাকা। গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে ফাইতং ইউনিয়নের সিমাতলী মাহামুদুল হকের মালিকাধীন এমবিআই ইটভাটায় স্কেভেটার দিয়ে সমান তালে মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন হতে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ বছর লামা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় নতুন পুরাতন মিলে গড়ে উঠেছে ৩০টি ইটভাটা। এরমধ্যে ফাইতং ইউনিয়নে ২৪টি, ফাঁসিয়াখালীতে ৬টি, গজালিয়ায় ২টি, সরই-এ ১টি এবং লামা পৌরসভায় ১টি। এসব ইটভাটার কোনটিরই নেই সরকারি অনুমোদন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইটভাটা মালিক জানান, লামা উপজেলার ১৩টি ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ে মালিকপক্ষ হাইকোর্টে রীট করে। সেই রীটের অনুবলে তারা ইটভাটা চালাচ্ছে। রীটের রায় না হতে ইটভাটা চালানো যায় কিনা প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
ফাইতং এলাকার ইটভাটা গুলো হচ্ছে, এসমিএম, এফবিএম, এবিএম, এমবিএম, এবিসি, এবিসি (২), টিএইচবি, ইউবিএম, এসকেবি, এসএবি, এফএসি, এসবিডব্লিউ, পিবিসি, এমবিএম, ইবিএম, বিবিসি, এইচবিএম, এএমবি, থ্রিবিএম, ফাইতং (মানিকপুর অংশে) ফোরবিএম, মো, এনাম ব্রিকস, গিয়াস উদ্দিন ব্রিকস, মো, নাছির ব্রিকস, আব্দুর রহমান/জসিম ব্রিকস, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে এমএসবি, এএইচবি, কেবিসি, এমএইচবি, বিএনবি, পিবিএম, গজালিয়া ইউনিয়নে কেএমবি, এসবিএম, সরই ইউনিয়নে আরএনবি ও লামা পৌরসভায় এসবিএম। লামার ফাইতং এলাকার ঘুরে দেখা যায়, ২৪টি ইটভাটার ইট-মাটি পরিবহন ও জ্বালানী লাকড়ি সংগ্রহ কাজে ব্যবহৃত ভারী ট্রাকের কারণে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙ্গে চরম বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে গ্রামীণ অবকাঠামো। পাহাড়ি গ্রাম রাইম্যাখোলা, শিবাতলী পাড়া, মংব্রাচিং কারবারী পাড়া, ফাদু বাগান পাড়া, হেডম্যান পাড়া ও বাঙ্গালি পাড়ার অধিবাসীরা জানান, ইটভাটার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে বিগত সময়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের বরাবর আবেদন করেও প্রতিকার পায়নি।
বনজ সম্পদ ব্যবহারের সহজ লভ্যতা ও দুর্বল প্রশাসনিক তদারকির কারণে ফাইতং ইউনিয়ন অবৈধ ইটভাটা স্থাপনের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। দিনে দিনে ইটভাটার সংখ্যা বাড়ছে। এক নাগাড়ে ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কারণে স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে শ্বাসকষ্ট প্রদাহ জনিত রোগ, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে লক্ষ্য করা যায় প্রত্যেকটি ইটভাটা বনের ভিতরে ও পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে। যাতে করে চরম হুমকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ।
জানা গেছে, চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ফাইতং-এ ২০১৫ সালে পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাতেও টনক নড়েনি কারো। ইটভাটাকে নিরুৎসাহিত করতে ভূমিকা নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয়রা বলেন, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের এবছর নতুন করে আরো ৩টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। সব মিলে এবার ইটভাটার সংখ্যা ৬টি। নতুন ইটভাটা করতে গিয়ে নতুন নতুন পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে এবং শেষ হচ্ছে বনাঞ্চল। প্রশাসনকে বলেও প্রতিকার মিলছেনা। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালালেও তারা চলে গেলে আবারো পুরোদমে ইটভাটা শুরু হয়। দিনের পর দিন বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকা চেহারা। উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো সমতল হচ্ছে। বৃক্ষ উজাড় হতে হতে মরুময় হয়ে গেছে পুরো এলাকা। ভরাট হয়ে গেছে ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া ও খাল। বিরানভূমিতে রূপ নিয়েছে এই জনপদ। ইটভাটার কয়েকশত গজের মধ্যেই পুলিশ ফাঁড়ি, বন বিভাগের বিট অফিসারের কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়। কিন্তু বন ও পাহাড় ধ্বংসের এমন হরিলুটের মাঝখানে বসে তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
প্রসঙ্গত, ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩’ না মেনে পাহাড় কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে এবং ইট পোড়ানোর জন্য প্রাকৃতিক বনা লের কাঠ কাটা হচ্ছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ৬ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানী হিসেবে কোন জ্বালানী কাঠ ব্যবহার করতে পারবেন না’। এ আইন অমান্য করলে ‘অনধিক ৩ বৎসরের কারাদন্ড বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন’ মর্মে এ আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে। একই আইনের ৪ ধারায় উল্লেখ আছে ‘জেলা প্রশাসকের নিকট হতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করতে পারবেন না’। ৫নং ধারায় বলা আছে, ‘কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হতে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল ব্যবহার করা যাবে না’।
এছাড়াও ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত উপজেলা বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে কোন ব্যক্তি ভারি যানবাহন দ্বারা ইট বা ইটের কাঁচামাল পরিবহন করা যাবে না’ মর্মে আইনে উল্লেখ আছে। আইন অনুযায়ী পার্বত্য জেলায় ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে, পার্বত্য জেলার পরিবেশ উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্যকোন স্থানে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে ১ কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে এবং ইউনিয়ন সড়ক হতে আধা কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবেনা।


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language