শিরোনাম

বান্দরবান সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবায় খামখেয়ালি

কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা মিলছে না দেড়শ’ শয্যায় উন্নীত হওয়া বান্দরবান সরকারি হাসপাতালে।

চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীরা নিয়মিত হয়রানি এবং দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছে সরকারি এই হাসপাতালে।

রোগীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তদারকি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি না থাকায় বান্দরবান সদর সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

এখানে বর্তমানে কোনো রোগেরই চিকিৎসা পাচ্ছে না রোগীরা। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডেলিভারি, ডায়রিয়া এবং দুর্ঘটনায় হতাহত রোগীদের দায়সারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বান্দরবানের বেসরকারি হাসপাতালগুলো সহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাবার ফ্রি পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

রোগীর স্বজন মোহাম্মদ রাহাত অভিযোগ করে বলেন, হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় আমার এক আত্মীয়কে বান্দরবান সদর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাই। জরুরি বিভাগে কর্মরত নার্সের আচরণে মনে হলো রোগীকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে অন্যায় করে ফেলেছি। হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক না থাকায় দায়িত্বরত নার্স রোগীকে ভর্তি করিয়ে উধাও।

কিছুক্ষণ পর আরেকজন নার্স এসে রোগীকে ওয়ার্ডে নিয়ে একটি স্যালাইন দেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দায়িত্বরত চিকিৎসককে রোগীর স্বজনরা ফোন দেয়ার অনেকক্ষণ পর চিকিৎসক এসে রোগীকে দেখলেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলেন। বিকালে চিকিৎসক চেম্বারে ঢুকে জানান, “রিপোর্ট দেখেছি সবকিছু নরমাল, কোনো সমস্যা নেই। তারপর চিকিৎসক একটি সাদা কাগজে ‘আমি রোগীর গার্জিয়ান, আমার আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা করাতে পারছি না। তাই আমি রোগীকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে যেতে চাই। এতে রোগীর কোনো প্রকার দুর্ঘটনা হলে ডাক্তার বা নার্স দায়ী থাকবে না‘ কথাগুলো লিখে আমায় স্বাক্ষর করতে বলেন। এই হলো বান্দরবান সরকারি হাসপাতালের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা।”

পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জাবেদ রেজা অভিযোগ করে বলেন, ‘নভেম্বর মাসের শেষদিকের ঘটনা। বাসস্ট্যান্ড এলাকার এক বাসিন্দা যিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন তাকে হাসপাতালে নেয়া হলো। খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমের দরজার সামনে রোগী স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। ডাক্তারের খবর নিতে ইমার্জেন্সি রুমে গিয়ে দেখি দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করা। বহুবার ডাকার পর একজন নার্স বেরিয়ে আসলে বললাম, বাইরে মুমূর্ষু রোগী, আপনি ভিতরে দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছেন। উত্তরে নার্স বললেন, এখনতো ঘুমানোর সময়। নার্সকে বললাম, আমি কাল বিষয়টি আরএমওকে জানাব। উত্তরে নার্স বললেন, কাল কেন? এখনি জানান। একজন নার্সের দাম্ভিকতা দেখে আমি রীতিমত অবাক হলাম। এ যদি হয় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তদারকি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি না থাকায় কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না রোগীরা।‘

অপরদিকে কাগজে-কলমে থাকলেও বান্দরবান হাসপাতালে কর্মস্থলে থাকে না চিকিৎসকরা।

রবিবার সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ১০ জন ডাক্তারের কর্মস্থলে ডাক্তার উপস্থিত আছেন মাত্র ৪ জন। তারা হলেন, ডা. সমিরন নন্দী, ডা. সামিরা, ডা. রিপন এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. নাজনীন আহমেদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাকি ৬ জন চিকিৎসক বান্দরবানেই নেই। এমনকি সদর হাসপাতালের আরএমও সরকারি প্রশিক্ষণে ঢাকায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মচারীরা। সদর হাসপাতালের চারপাশ এবং টয়লেটগুলো অপরিষ্কার এবং নোংরা। নালায় জমে আছে নোংরা, ময়লা পানি যেখান থেকে মশা সহ বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে মানবদেহে।

চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী অভিযোগ করে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষেরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে ভিড় জমায় কিন্তু দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখাতে পারলেও ঔষধপত্র এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। যন্ত্রাংশ নষ্ট, জনবল নেই এবং ঔষধের সরবরাহ নেই অজুহাতে রোগীদের কাঙ্খিত সেবা দেয়া হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করে গরীব-অসহায় মানুষের চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। হাসপাতালের টয়লেট এবং চারপাশের পরিবেশ খুবই অপরিষ্কার।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একশ পঞ্চাশ শয্যায় উন্নীত বান্দরবান সদর হাসপাতালে ডাক্তারসহ আনুষঙ্গিক লোকবল রয়েছে এখনো ৫০ শয্যার সমমানের। বর্তমানে সদর হাসপাতালে কাগজে-কলমে কর্মরত ২১ জন ডাক্তারের স্থলে রয়েছে ১১ জন চিকিৎসক। ডাক্তারের বাকি ১০টি পদ এখনো শূন্য। সিনিয়র স্টাফ নার্স ২২ জন, স্টাফ নার্স ৯ জন, সহকারী নার্স ৫ জনসহ মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট, ফার্মাসিস্ট, হেলথ এডুকেটর, অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ড্রাইভার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকর্মীসহ ৭১ জনের কর্মস্থলে ৬৯ জন কর্মরত আছেন। নেই ১জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ১জন হেলথ এডুকেটর।

সরকার অনুমোদিত পদগুলোর মধ্যেও ডাক্তার, সিনিয়র-জুনিয়র নার্স, স্বাস্থ্যসেবিকা, টেকনোলজিস্ট, অফিস সহকারী, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর্মীদের অনুপস্থিতির ফলে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা।

এ বিষয়ে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. অংসু প্রু বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের অবস্থা আগের চেয়ে অনেকগুণ ভালো স্বীকার করতে হবে তবে চিকিৎসক, জনবল এবং লজিস্টিক সংকটে রোগীদের কাঙ্খিত সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না কথাটিও মিথ্যা নয়। কিন্তু সারাদেশে শূন্য পদগুলোতে ডাক্তার এবং জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিয়োগ হলে দ্রুত সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে। দায় এড়াতে রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় ডাক্তাররা অনেক সময় ঝুঁকি নিতে চান না তবে আমি চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়েছি অযথা হয়রানিমূলক কোনো রোগীকে যাতে রেফার করা না হয়। এছাড়াও আর্থিক সংকটে যারা বাইরে চিকিৎসা করাতে পারছে না তাদের লিখিত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।’


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language