শিরোনাম

লকডাউনে শিক্ষিকাকে পিঠিয়ে রাস্তায়: জমি নিয়ে বিরোধের জের

শিক্ষকতা মানব জাতির মহান পেশা বটে, তবে জোর যার মুল্লুক তার এ কথা সত্য। তাই একেক দেশ একেক জাতি শিক্ষককে সম্মান দিতে শিখেছে একেকভাবে। যেমন পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার রাস্তায় সর্বোচ্চ ভিআইপি প্রটোকল দেয় ট্রাফিক পুলিশ, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্ধারিত যাতায়াত করানোর গাড়িকে। বিচারক, মন্ত্রী, এমপি এর গাড়িকে থামিয়ে শিক্ষকের গাড়িকে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উন্নত দেশ জাপান, ছাত্রদের পিছন ফিরে বসতে হয় শ্রেণীকক্ষে, সামনা-সামনি বসা যায় না সেখানে। শিক্ষক জাতিকে সর্বোচ্চ সম্মান করা জাতি সনাতনী প্রথায় পা ছুঁয়ে সালাম করা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দেখা যায় মাটিতে লুঠিয়ে হাঁটু গেড়ে সিজদায় রত হওয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যায় স্বজাতিরাই যেন পিঠালো স্বজাতি শিক্ষিকাকে। বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এ যখন সারা পৃথিবীর মানুষগুলো কাতর, লোভে লোভাতুর মানুষের নির্যাতন তখনও থেমে নেই। সম্প্রীতির বান্দরবানে এক জঘন্য কান্ড ঘটালো হিং¯্র মনুষ্য দানবের আচরণে আহত হলো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সখিনা। বিচারের আশায় কখনো থানায়, কখনো গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে কিন্তু ফিরে দেখার কেউ নাই। দেখবেও না কারণ পেশায় শিক্ষক হলেও তেমন কোন প্রভাব প্রতিপত্তি নেই। বয়সের ভারে নূয়ে পড়া মাতৃতুল্য এ শিক্ষিকা পাহাড়ে উপজাতীয় শিশুদের মাঝে আলো ছড়িয়ে গেছেন ঠিকই। পেশী শক্তি না থাকায় হয়তো আজ এ অত্যাচারের শিকার। এক যুগেরও বেশী সময়কাল ধরে নিম্ম ও উচ্চ আদালতে মামলা চলছিল স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী প্রয়াত এস কে রাজ্জাক এর সাথে শিক্ষিকা সখিনার। মূলত: সখিনার বাবা ৬০ বছর পূর্বে থেকেই বান্দরবানে বসবাস। জীবিকার তাগিদে বান্দরবানে আগমন ঘটে এস কে রাজ্জাকের। প্রয়াত রাজ্জাক সখিনার বাবার কাছে একটুখানি মাথা গোজার আশ্রয় চাই। সখিনার বাবাও সরল মনে আশ্রয় দেয়। এদিকে শ্রম দিয়ে টাকার পাহাড় গড়তে শুরু করে প্রয়াত রাজ্জাক। ধীরে ধীরে হয়ে যায় এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। সে’বার সখিনার বাবাকে জমি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। সখিনার বাবাও মেয়েদের ভবিষ্যতে কিছু করতে পারবে আশায় জমি বিক্রি করে। পাশাপাশি একই হোল্ডিংয়ে জমি হওয়ায়, সমতল ভ‚মিতো নয়, এ ভ‚মি পাহাড়ী ভ‚মির আদলে চাষাবাদের জমি, পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাসের উপযোগীও হয়েছে বটে। পার্বত্য অঞ্চলে ক্যাডেষ্টাল সার্ভে নাই বলে এ বিরোধের যেন অন্ত নেই। প্রয়াত রাজ্জাক ক্রয়কৃত দলিল মতে সখিনার বাবা থেকে জমিও বুঝে পেয়েছিল বটে। সখিনার বাবার মৃত্যুর পর আগ্রাসী হয়ে উঠে রাজ্জাক। শুরু করে শিক্ষিকার মায়ের উপর নির্যাতন। বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় শিক্ষিকার মা একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তারপর থেকে শুরু হয় সুযোগ্য কন্যা শিক্ষিকা সখিনার উপর উৎপীড়ন। দীর্ঘ বহু বছর মামলা নিম্ম আদালত হতে উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাদেশ হলেও কিছুতেই যেন সুরাহা হবার নয়। জঠিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রাজ্জাক। রাজ্জাকের ঘরে কোন পুত্র সন্তান না থাকায় অনায়াসে অভিভাবকের দায়িত্বে শ্যালক জয়নাল যেন কিছুতেই ছাড়বে না এবার শিক্ষিকা সখিনাকে। ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে থাকে এলাকায় কিছু দুস্কৃতিকারী আবদুল মান্নান, সাহাদ হোসেন, কবির শেখ, মাহাবুল আলম, সাদ্দাম হোসেন, বাদশা মিস্ত্রি, কালু মিয়া, শাহজান, রেজাউল, জাকির, রফিক, খলিল মাঝি সহ আরো অনেকে। এবার তাদেরকে লেলিয়ে দেয় শিক্ষিকা সখিনার উপর। গত ৫ মে ২০২০ রোজ মঙ্গলবার রাত ৮.৩০ টায় সখিনার বসতঘরে প্রবেশ করে ইট, লাঠিসোটা, দা, কুড়াল দিয়ে ভাংচুর শুরু করে। শিক্ষিকা সখিনা প্রতিবাদ করলে শ্যালক জয়নাল তার দৃস্কৃতিকারী বাহিনী নিয়ে সখিনার বোনকে সহ লাঠি দিয়ে দুই পায়ে, হাঁটুতে ও বাম হাতের বাহুতে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে পিঠিয়ে নীলাফুলা জখম করে ঘর থেকে বাহির করে দেয়। অভিযুক্ত জয়নাল থানায় গিয়ে বিচার দেয় বলে হুংকার দেয়। এবার শিক্ষিকা সখিনা থানায় বিচারের দ্বারস্থ হয়। থানা কর্তৃপক্ষ মেডিকেল সনদ চাইলে, হাসপাতালে জরুরী বিভাগে গিয়ে চিকিৎসা শেষে পূনরায় থানায় এসেও অভিযোগ দায়ের করতে ব্যর্থ হয় শিক্ষিকা সখিনা। তখন সখিনার মাথায় যেন এক বাজ পড়ে যায়। মনে হয় যেন এক পৃথিবীটাই তার কাছে মৃত্যুপূরী। শিক্ষিকা সখিনা অবশেষে ভোর ৪টায় বাসায় এসে দেখতে পায় ব্যবহারের আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ, টিভি, রাইচ কুকার, ফ্যান, পানির মটর, র্স্বণালংকার, কাপড়চোপড়, নগদ টাকা লুটপাট করে নিয়ে যায় হামলকারীরা। তৎসাথে টিনের ছাউনীর ক্ষতিসাধন করে। তার এ ব্যবহার্য জিনিসপত্র কর্মজীবনের আয়ের টাকা দিয়ে ঝোগাড় করেন। যার বাজার মূল্য প্রায় ৪ লক্ষাধিক টাকা হবে। এই শিক্ষিকা সখিনা যেন মনে হয় এক ঘরে করে রাখা কেউ, যাকে সমাজের কারো সাথে মিশতে না দেওয়া, এক বোন সহ তার জীবন ঐ সেমিপাকা ঘরে। বিদ্যুৎতের লাইনও কেটে দেওয়া হয়েছে বারবার। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় ডিশলাইন। শিক্ষিকা সখিনার ঘরের পাশ দিয়ে সরকারী অফিসার্স কলোনী রয়েছে। সন্ধ্যার পর, এর পাশেই বসে নেশাখোরের আড্ডা, কোভিড-১৯ লকডাউন চলাকালে একাধিক মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ হওয়া স্বত্তে¡ও, শিক্ষিকা সখিনা পুলিশ প্রশাসনের কাছে এবং জেলা প্রশাসনের সমীপে ২৬/৪/২০ ইং তারিখে লিখিত অভিযোগ দেন। একাধিকবার থানায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করে নেশাখোরের আড্ডা ভন্ডুল করতে ব্যর্থ হন। এতেই প্রভাবশালী জয়নাল এর সাথে নেশাখোর দুস্কৃতিকারীদের পারষ্পারিক সমন্বয় ঘটে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিপক্ষ জয়নালের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষিকা সখিনা দুষ্ঠ মহিলা। তার নানান আচরণে অতীষ্ঠ হয়ে এলাকাবাসী প্রতিবাদ করেছে মাত্র। প্রসঙ্গত: মামলার নথি পত্র পর্যালোচনা করে এ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। বান্দরবান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পিটিশন মামলা নং-৫৭/২০১৯ ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৩৩ ধারামতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাসহ গৃহ নির্মাণের কাজ বন্ধের আদেশ প্রদান করেন। (থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই কোহিনুর তাং-২৫/০৫/১৯ ইং।) বান্দরবান দায়রা জজ আদালতের ফৌজদারী রিভিশন মামলা নং-১০০/২০১৯ আদেশ নং-০২, তাং-২৭/১১/১৯ ইং তারিখে অন্তবর্তীকালীন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদান করেন। যাহা শামশুন নাহার অমান্য করিয়া চলিতেছে। তৎসাথে প্রভাবশালী জয়নাল সহযোগিতা করিতেছে। (পুলিশ সুপার এর কার্যালয় এর স্মারক নং-৪৪৬৩/২য় তাং-০৪/১২/২০১৯ এর নোটিশ জারী করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা-এনামুল হক ভূঁইয়া)। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের আদালতে দায়েরকৃত মিস রিভিশন (বান্দরবান) মামলা নং-০৪/১৯ মূলে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সহ সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঝঃধঃঁংয়ঁড় প্রদান করা হয়। বিজ্ঞ আদালত ৬/১১/২০১৯ জেলা প্রশাসকের আদেশ বলবৎ রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। বান্দরবান পৌরসভার নির্র্বাহী প্রকৌশলী মংসুইখই মারমা এর স্মারক নং-২০১৩/৬২১ তাং-২/৬/০১৩ খ্রিঃ মূলে চলাচল রাস্তার উপর গৃহ নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও যা বাস্তবায়িত হয় নাই। মূলত চলাচল রাস্তায় প্রতিপক্ষের গৃহ সম্প্রসারণ করায় বাদীর গৃহে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ হওয়ায় মৌলিক অধিকার খর্ব হইতেছে বলিয়া প্রতিবেদকের ধারণা।


Print pagePDF pageEmail page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

See In Your Language